বাংলাদেশ আন্দোলন: সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে
১৯৪৭ সালে যখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয় তখন বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত ছিল। আজ ১৯৭১ সালে তাঁদের সকলেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত। বুদ্ধিজীবীদের মানসচৈতন্যের এই পরিবর্তন বিস্ময়কর হলেও অস্বাভাবিক নয়। দেশবিভাগের পূর্বে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের একটি প্রবল প্রতিবাদ ছিল অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে। এই অর্থনৈতিক শোষণের ক্ষমতা ছিল যাদের, তারা সেই ক্ষমতার প্রয়োগে শিক্ষা ও রাজনীতি ক্ষেত্রে আপন প্রতিষ্ঠাকে সম্ভবপর করেছিল। তাই অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ একটি রাজনৈতিক পরিমণ্ডল নির্মাণ করেছিল বাংলাদেশের মানুষের জন্য। তখন অর্থনৈতিক ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত ছিলেন বাংলাদেশের হিন্দু ভূস্বামীবৃন্দ এবং এই ক্ষমতার বলে শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁরা ছিলেন অগ্রসর এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা লাভের অধিকারী। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বে সকল ক্ষেত্রে অধিকার লাভের জন্য বাংলাদেশের মুসলমানদের যে-সমস্ত আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে সেগুলো হচ্ছে: (১) আধুনিক ইংরেজী শিক্ষার জন্য আন্দোলন; (২) অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তির আন্দোলন; (৩) প্রাদেশিক পরিষদে ন্যায্য আসন লাভের জন্য আন্দোলন। গুরুতরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, সব কটি আন্দোলনই অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তির আন্দোলন; ইংরেজী শিক্ষায় মুসলমানরা হিন্দুদের সঙ্গে সমকক্ষতা রক্ষা করতে পারছে না বলে ব্যবসা এবং চাকুরীতে পিছিয়ে আছে। আবার প্রাদেশিক পরিষদে যথাযথ সংখ্যা নেই বলে অর্থনৈতিক অধিকারকে তারা ন্যায্য প্রমাণ করতে পারছে না। সুতরাং এ-কথা বললে অন্যায় হয় না যে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বে মুসলমানদের সকল আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল সমাজ এবং জীবন (এর) ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তি এবং সুপ্রতিষ্ঠা লাভ। অবাঙালী মুসলমান নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের মুসলমানদের এই অভিযোগকে তাদের রাজনৈতিক আন্দোলনে ক্রমশ ব্যবহার করতে লাগলেন। মি. জিন্নাহ্ ভারতীয় মুসলমানদের জন্য যে ১৪ দফা আন্দোলন শুরু করলেন তাতে বাঙালী মুসলমানরা তাদের জন্য মুক্তির আশ্বাস আছে বলে মনে করেছিল এবং মুসলমানদের এই মানসিকতা নির্মাণের কাজে যেসব বাঙালী মুসলমান নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁরা ছিলেন সাধারণ বাঙালী সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন উর্দু ভাষী বিত্তবান মুষ্টিমেয় কয়েকজন লোক। যেমন ঢাকার নবাব পরিবারের খাজা নাজিমুদ্দিন। সাধারণ বাঙালী মুসলমানের নেতা ছিলেন জনাব ফজলুল হক সাহেব; কিন্তু সময়ের অভিঘাতে তিনি তখন রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিপর্যন্ত। একটি প্রবল আবেগের উচ্চরোলে বাংলাদেশের মুসলমানরা তখন সম্মোহিত। তারা তখন মি. জিন্নাহকে নেতৃত্ব দিয়েছে যিনি সাম্প্রদায়িকতাকে মূলমন্ত্র করে হিন্দু বিরোধিতাকে একটি তীব্র ভাবাবেগে পরিণত করেছেন। জনাব ফজলুল হক সাহেব অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুসলমান কৃষকদেরকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন, মহাজনদের কাছ থেকে ঋণগ্রস্ত দরিদ্র মুসলমানকে মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পূর্বে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী মুসলমান সাময়িক অন্ধতা বশে ফজলুল হককে অস্বীকার করেছিল। মি. জিন্নাহর আন্দোলনে তারা অকস্মাৎ যে আবেগকে অবলম্বন করেছিল ফজলুল হকের রাজনীতি সে আবেগের বিরোধিতা করছে ভেবে তারা ফজলুল হককে অগ্রাহ্য করল। সে সময় বাংলাদেশে পাকিস্তান আন্দোলনের দার্শনিক ছিলেন প্রধানত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলমান অধ্যাপকবৃন্দ এবং উৎসাহী কর্মী ছিলেন মুসলমান ছাত্রবৃন্দ। ফজলুল হক মুসলমান কৃষক সমাজকে জানতেন কিন্তু তখনকার ছাত্রসমাজের চিন্তাধারার সঙ্গে তাঁর কোনও সংযোগ ছিল না। তাই দুর্বলের আত্মপ্রতিষ্ঠা তাঁর সারা জীবনের লক্ষ্য হলেও সেই আত্মপ্রতিষ্ঠার যে নতুন সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যা বুদ্ধিজীবী সমাজে গৃহীত হয়েছে সে ব্যাখ্যাকে তিনি কাজে লাগাতে চান নি। একটি হিংসার রাজনীতিকে সচল করে দরিদ্র মুসলমানদের জন্য অর্থনৈতিক শোষণ-মুক্তির যে-স্বপ্ন সৌধ জিন্নাহ্ সাহেব নির্মাণ করলেন তাতে বাঙালী মুসলমান বিভ্রান্ত হল। এভাবে নেতিবাচক রাষ্ট্রীয় চেতনায় পাকিস্তান আন্দোলন একটি তথাকথিত স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হল। সর্বদেশব্যাপী প্রবল সাম্প্রদায়িক বিক্ষোভের ফলশ্রুতি-স্বরূপ স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হল। এই স্বাধীনতার পেছনে আত্মত্যাগ ছিল না, দেশপ্রেম ছিল না, অন্তর্দাহ ছিল না, ছিল শুধু
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments